Header Ads Widget

সুনামগঞ্জ সরকারী হাসপাতালে অনিয়ম ও দুর্নীতি : চিকিৎসা সেবায় তেলেসমাতি

মোঃ আক্তার হোসেনঃহাওরাঞ্চল খ্যাত সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলা ও একটি থানার প্রায় ২৫ লাখ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসা সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল। বিভিন্ন অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে হাওরপাড়ের রোগীরা সঠিক চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। সেবা নিতে আসা রোগীদের টাকা ছাড়া কোনো ওষুধ মিলছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

সেবার নামে অনিয়ম আর দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হচ্ছে এই সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালটি। জেলার যোগাযোগবিচ্ছিন্ন বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল এটি। হাওরপাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে প্রতিনিয়ত রোগীরা আসছেন জেলার ২৫০ শয্যা সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে; কিন্তু এখানে চিকিৎসার নামে চলছে রোগীদের সাথে প্রতারণা। 

প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন হাওরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনেরা। যেখানে দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের সরকারিভাবে চিকিৎসাসেবা ও ফ্রি ওষুধ পাওয়ার কথা সেখানে হাসপাতালের একটি সিন্ডিকেট চক্রের শরণাপন্ন হয়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনেরা।

অন্য দিকে ওই চক্র দীর্ঘ দিন ধরে কোটি কোটি টাকার সরকারি ওষুধ রোগীদের ফ্রি না দিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ফার্মেসিতে দিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফ্রি ওষুধ না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে মোটা অঙ্কের টাকায় কিনতে হচ্ছে ওষুধ। দীর্ঘ দিন ধরে সরকারি চিকিৎসাসেবা নিয়ে চলছে লুটপাটের ব্যবসা। হাসপাতালে কর্তব্যরত কিছু তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ও বাইরের কিছু লোক মিলে সিন্ডিকেট করে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। 

হাসপাতালের এমন অনিয়ন-দুর্নীতি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হলেও কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনেরা রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছেন। ওয়ার্ড থেকে শুরু করে হাসপাতালের প্রতিটি কক্ষে সিট-বাণিজ্য আর অনিয়ম-দুর্নীতি নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিন হাসপাতালে ঘুরে প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক ওয়ার্ডকিপার, কেরানি, রোগী ও স্বজনদের সাথে কথা বলে এবং অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই চক্র দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে হাসপাতালে আসা রোগীদের কাছ থেকে সেবার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। প্রতিদিন হাসপাতালে আসা শত শত রোগীর আহাজারি ও ভুক্তভোগীর নালিশ শুনতে শুনতে কান ভারী হয়ে উঠেছে। 

জেলার ২৫ লাখ মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য সরকার এই হাসপাতালে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বরাদ্দ দিয়ে থাকে; কিন্তু রোগীদের স্বল্প মূল্যের প্যারাসিটামল, এন্টাসিডের মতো ওষুধ ফ্রি দেয়া হলেও দামি ওষুধগুলো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কালোবাজারে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। বরাদ্দকৃত টাকার মধ্যে লোক দেখানো কিছু কাজ করে বেশির ভাগ টাকা সঠিকভাবে ব্যয় না করে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

সদর হাসপাতালের ফার্মেসি ওষুধ বিতরণ কেন্দ্রের দেয়ালে চার্ট টাঙিয়ে কী কী ওষুধ রোগীদের দেয়া হয় তার জন্য জনসম্মুখে একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে তুলে ধরেছে কর্তৃপক্ষ; কিন্তু বাস্তবে রোগীদের কী কী ওষুধ দেয়া হচ্ছে কর্তৃপক্ষ কোনো দিন মনিটরিং করেছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে ভুক্তভোগীদের। এ হাসপাতালে ওষুধসামগ্রী ও উন্নয়নে প্রতি বছর সরকার কত কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় তার তালিকা চেয়েও কর্তৃপক্ষের কাছে পাওয়া যায়নি।

হাসপাতালে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বহিঃবিভাগে আসা রোগীদের চিকিৎসার জন্য শুধু ওষুধ বিতরণ কেন্দ্রে রাখা হয়েছে ৩১ ধরনের ওষুধ।

যার মধ্যে ক্রো-ট্রাইমোক্সজোন, প্যারাসিটামল, মেট্রোনিডাজল, সালবুটামল, অ্যামক্সসিলিনসহ সাত ধরনের সিরাপ রয়েছে। 
এ ছাড়া প্যারাসিটামল-৫০০ এমজি, এন্টাসিড, মেট্রোনিডাজল, কট্রিম, হিস্টাসিন, পেনিসিলিন, সিক্সোফক্সাসিন-৫০০ এমজি, নিভোফক্সাসিন, ফেরাস সালফেড, বি-কমপ্লেক্স, মেবেনডাজল, এলবেনডাজল-৪০০ এমজি, সালবুটামল, হাইসুমাইড, ডাইক্লোফেন-৫০ এমজি, পেডনিসলন, পেনট্রোফ্লাজল-৪০-২০ এমজি, বিবি লোজন, বেনজিক এসিডওয়েল মেট, ক্যাপসুল টেট্রাসাইক্লিন-২৫০ এমজি, অ্যামক্সসিলিন-২৫০ এমজি, সেফরাডিন-৫০০ এমজি, ওমিপ্রাজল-২০ এমজি ছাড়াও স্টকে থাকা ওষুধ প্রত্যকটি ওয়ার্ডে বিতরণ করার কথা; 
কিন্তু ওইসব ওষুধ থাকার পরও রোগীদের সেবায় তা ব্যবহার না করে চক্রটি বাইরে কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ফলে রোগীদের হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনে আনতে হচ্ছে।

হাসপাতালে সেবা নিতে আসা গৌরারং ইউনিয়নের নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ হিসেবে এই সরকারি হাসপাতালে আইছিলাম বিনা টেহায় আমার বাচ্ছার চিকিৎসা দিতে। কিন্তু দেখলাম ডাক্তার আমারে ৬০০ টাকার ওষুধ লেখে দিছে আর একটা নাপা সিরাপ হাসপাতাল থেকে দিছে।

 মাইজবাড়ি এলাকা থেকে আসা নজিম মিয়া বলেন, ‘আমরা হাসপাতালে সরকারি ওষুধ পাবার আশায় আইছি, কিন্তু এক পাতা প্যারাসিটামল ছাড়া কিছুই দেয় না। ডাক্তাররা বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে লিখি দেইন। এই যে অনিয়ম আর দুর্নীতি অইতাছে সরকার কি এইগুলা দেখে না।’ পৌর শহরের হাছন নগর এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা পারভীন বেগম বলেন, ‘আপনারে আর কী কইতাম, হাসপাতালে আইয়া প্যারাসিটামল আর নাপা, এন্টাসিড ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না, ডাক্তারের কাছে আইলেই টাকা দিয়া ওষুধ কিনা লাগে।’

হাসপাতালে ওষুধ বিতরণ কেন্দ্র যেখানে সকাল ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা সেটি দুপুর ১২টা থেকে বেলা ১টার মধ্যেই বন্ধ করে চলে যান দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিস্ট ও ইনচার্জ। ফলে অনেক রোগীকে ওষুধ বিতরণ কেন্দ্র বন্ধ দেখে ওষুধ ছাড়াই খালি হাতে বাড়ি ফিরতে দেখা যায়। হাসপাতালে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ক্লিনার থেকে শুরু করে প্রত্যেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এ ব্যাপারে সদর হাপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা: রফিকুল ইসলাম জানান, হাসপাতালের উন্নয়নে কী পরিমাণ টাকা বরাদ্দ আসে এবং কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয় তা তার জানা নেই। তবে সরকারি ওষুধ কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি ওষুধগুলোতে সরকারি মনোগ্রাম লাগানো থাকে, কাজেই এগুলো বাইরে বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই।

সিভিল সার্জন ডা: আশুতোষ দাসের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোবাইল ফোনটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ